কিছু সেনসিটিভ মুহূর্ত রয়েছে । যে মুহূর্তগুলোতে একজন ব্যক্তির কার্যকলাপ সারা জীবনের জন্য মানুষের হৃদয় মন ও মননে গেঁথে যায় । আমি ০৫ আগস্ট পরবর্তী লাগাতার কয়েক দিন আওয়ামী লীগের প্রশংসা করে স্ট্যাটাস দিয়েছি ফেসবুকে কারণ ওই মুহূর্তগুলো ছিল তাদের সেনসিটিভ সময় । আওয়ামী লীগের আলোচনা সমালোচনা লীগের আমলেও করেছি এখনো করতে পারবো । কিন্তু আমি সেনসিটিভ সময়গুলো এড়িয়ে চলি । আপনি একজন ব্যক্তিকে সারা জীবন ভালবাসলেন কিন্তু খাদের পাশ দিয়ে হাঁটার সময় অর্থাৎ সেনসিটি মুহূর্ত তাকে ল্যাং মেরে নিচে ফেলে দিলেন তখন কিন্তু সে আপনার সারা জীবনের অবদান ভুলে যাবে । আবার আপনি সারা জীবন একজন ব্যক্তির সাথে শত্রুতা করলেন কিন্তু তার স্পর্শকাতর মূহুর্তে তার পাশে দাঁড়ালেন তখন কিন্তু সে আপনার সারা জীবনের শত্রুতা ভুলে যাবে ।
রাজনীতিতেও মানুষের মনস্তত্ত্বের এই নিয়মটি প্রায় অবিকল কাজ করে। কারণ রাজনীতি শেষ পর্যন্ত কেবল ক্ষমতার খেলা নয়, এটি স্মৃতি, অনুভূতি এবং মানবিক আচরণেরও একটি ক্ষেত্র। মানুষের মনে কিছু দৃশ্য স্থায়ী হয়ে যায়। বিশেষ কিছু সময়ে কে পাশে ছিল, কে আঘাত করেছিল, কে নীরব ছিল এবং কে সাহস করে মানবিকতার পক্ষে দাঁড়িয়েছিল, ইতিহাস প্রায়ই সেসব মুহূর্তকে দীর্ঘদিন মনে রাখে।
রাজনৈতিক মতপার্থক্য সভ্য সমাজের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। গণতন্ত্রের সৌন্দর্যই হলো সমালোচনার অধিকার। কোনো দল, ব্যক্তি বা সরকারের সমালোচনা করা অন্যায় নয়। বরং গঠনমূলক সমালোচনা রাষ্ট্র ও সমাজকে আরও উন্নত করে। কিন্তু সমালোচনারও একটি সময় ও প্রেক্ষাপট আছে। যখন একটি ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠী অস্তিত্ব সংকটের মধ্য দিয়ে যায়, তখন অনেক সময় রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঊর্ধ্বে উঠে মানবিক আচরণই বড় হয়ে দাঁড়ায়।
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, বহু রাজনৈতিক নেতা তাদের প্রতিপক্ষের কঠোর সমালোচক ছিলেন, কিন্তু সংকটের সময় তাদের প্রতি ন্যূনতম মানবিক সম্মান প্রদর্শন করেছেন। আবার এমনও হয়েছে, কেউ সাময়িক রাজনৈতিক লাভের আশায় প্রতিপক্ষের দুর্দশাকে উপহাস করেছেন, কিন্তু সেই আচরণই পরবর্তীতে তার রাজনৈতিক পরিচয়ের অংশ হয়ে গেছে।
মানুষ সাধারণত যুক্তির চেয়ে স্মৃতিকে বেশি ধারণ করে। একটি কঠিন সময়ে বলা কয়েকটি সহানুভূতির বাক্য বহু বছরের বিরোধ ভুলিয়ে দিতে পারে। আবার একটি স্পর্শকাতর মুহূর্তে করা নির্মম আচরণ বহু বছরের সম্পর্ককে মুছে দিতে পারে। এ কারণেই পরিণত রাজনীতিবিদরা জানেন, সব যুদ্ধ সব সময়ে লড়তে হয় না। কিছু সময়ে মানবিকতা রাজনৈতিক অবস্থানের চেয়েও বেশি মূল্যবান হয়ে ওঠে।
আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি বিষয় ক্রমশ দুর্লভ হয়ে যাচ্ছে, তা হলো প্রতিপক্ষের মানবিক অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়া। আমরা অনেক সময় ভিন্নমতকে প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, শত্রু হিসেবে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি। ফলে সংকটের মুহূর্তেও বিদ্বেষের ভাষা থামে না। অথচ একটি সভ্য রাজনৈতিক সমাজে মতের সংঘর্ষ থাকবে, কিন্তু মানবিকতার পতাকা কখনো নামবে না।
রাজনীতির প্রকৃত শক্তি প্রতিপক্ষকে ধ্বংস করার মধ্যে নয়, বরং নিজের নৈতিক উচ্চতা ধরে রাখার মধ্যে। সাময়িক করতালি পাওয়ার জন্য অনেক কথা বলা যায়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেয় সেইসব আচরণ, যেখানে শক্তির সঙ্গে সংযম, মতবিরোধের সঙ্গে সৌজন্য এবং প্রতিযোগিতার সঙ্গে মানবিকতা উপস্থিত থাকে।
সময় শেষ পর্যন্ত অনেক হিসাব ভুলে যায়, কিন্তু মানুষের কঠিন সময়ে কারা পাশে দাঁড়িয়েছিল আর কারা আঘাত করেছিল, সেই স্মৃতি খুব কমই মুছে যায়। তাই রাজনৈতিক প্রজ্ঞার একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হতে পারে: সমালোচনা করুন, দ্বিমত পোষণ করুন, সংগ্রাম করুন, কিন্তু মানুষের স্পর্শকাতর মুহূর্তগুলোকে কখনো নিষ্ঠুরতার মঞ্চ বানাবেন না। কারণ ইতিহাস প্রায়ই বক্তব্যের চেয়ে আচরণকে বেশি দিন মনে রাখে।