মো: কামরুজ্জামান (লেখক বা ছদ্ম নাৃম: রবীন জাকারিয়া)
রংপুর জেলা প্রতিনিধি
রংপুরে শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী পরিবারের সকলকে একরাতে নৃশংসভাবে হত্যা করে তার বাড়িতেই ফ্রিজে রাখা খাবার খেয়ে। মাদক নিয়ে ডাকাতি করে সারারাত কাটিয়ে পরদিন পালিয়ে গেল।
রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত ধর্ম শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী এবং তাঁর পরিবারের নির্মম হত্যাকাণ্ডের তদন্তে দ্রুত অগ্রগতি হলেও পুলিশের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য, ময়নাতদন্ত ও ফরেনসিক পরীক্ষার প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত ডোমের বক্তব্য এবং পুলিশের ব্যাখ্যা নিয়ে তীব্র আলোচনা ও বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছিল। তবে পরবর্তী সময়ে ডোমের এই বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যাপক চাঞ্চল্য ও ধোঁয়াশা তৈরি হয়। এর প্রেক্ষিতে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ এবং ফরেনসিক বিভাগের চিকিৎসকেরা মেডিকেল সায়েন্সের তথ্যের ভিত্তিতে ডোমের বক্তব্যটি নাকচ করে দিয়ে সঠিক ব্যাখ্যা প্রদান করেন।
রংপুর মেডিকেল কলেজের মর্গে লাশ কাটার প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত ডোম যতন কুমার একটি বেসরকারি টেলিভিশনের সাক্ষাৎকারে দাবি করেছিলেন যে, শিক্ষক গণপতির মেয়ে আগামী চক্রবর্তীর লাশের শরীরে তিনি শারীরিক নির্যাতনের (ধর্ষণের) আলামত বা বীর্যের উপস্থিতি লক্ষ্য করেছেন। দীর্ঘদিন এই পেশায় থাকার অভিজ্ঞতার বরাত দিয়ে তিনি দাবি করেন, মৃতদেহ দেখেই এটি বোঝা যাচ্ছিল এবং তিনি নিজে পরীক্ষা করার সময় তা পেয়েছেন। তবে মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)-এর অনুসন্ধানী দলের কাছে ডোম যতন কুমার পরবর্তীতে জানান যে, তিনি ধারালো অস্ত্রের কোনো আঘাত দেখেননি এবং প্রথম নজরে তাঁর কাছে এটি ধর্ষণের মতো মনে হলেও চূড়ান্ত বিষয়টি পরীক্ষার পরেই নিশ্চিত হওয়া যাবে।
তাছাড়া শুধুমাত্র দুজন ইয়াবা বা মাদক সেবনকারীর পক্ষে এমন সিরিয়াল কিলিং সম্ভব কী না এসব নিয়ে বর্তমানে জনমনে তীব্র ক্ষোভ ও ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। ২০২৬ সালের ২২ আগস্ট রাতে রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়া এলাকার একটি তিনতলা ভবন থেকে শিক্ষক গণপতি (৬০), তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা (৫০), মেয়ে আগামী (২৫) এবং ছেলে প্রীয়মের (১২) গলিত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ঘটনার পরপরই পুলিশ মাছুয়াপাড়া এলাকা থেকে মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাস নামের দুই তরুণকে গ্রেপ্তার করে, যারা আদালতে ১৬৪ ধারায় হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত থাকার জবানবন্দি দেয় এবং তাদের কাছ থেকে লুণ্ঠিত স্বর্ণালংকার উদ্ধার করা হয়।
প্রাথমিক বিজ্ঞপ্তিতে পুলিশ জানায়, ভবনের ছাদে আসামিদের ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ায় এই হত্যাকাণ্ড ঘটে। তবে পরবর্তীতে পুলিশ তাদের তদন্তের বিবরণী পরিবর্তন করে জানায়, গণপতির পরিবারের কেনা জমি সংক্রান্ত পুরনো ক্ষোভ এবং সামাজিক মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বও এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে কাজ করেছে।
পুলিশের এই ঘন ঘন তথ্য পরিবর্তন ও তদন্তের অসংগতি নিয়ে বর্তমানে রংপুরের সুধী সমাজ ও সাধারণ মানুষ অসন্তোষ প্রকাশ করছেন। সম্প্রতি 'রংপুর মহানগর নাগরিক কমিটি' সংবাদ সম্মেলন করে পুলিশের তদন্ত ও বক্তব্য নিয়ে ১৯টি সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন তুলে ধরে ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি করেছে। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)-ও পুলিশের বর্ণনায় থাকা নানা অসঙ্গতি ও অস্পষ্টতা দূর করার তাগিদ দিয়েছে।
এদিকে, হত্যাকাণ্ডের ভয়াবহতা ও নৃশংসতা বিবেচনা করে রংপুর আইনজীবী সমিতি একটি ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে; তারা ঘোষণা করেছে যে কোনো আইনজীবীই এই মামলার আসামিদের পক্ষে আদালতে আইনি লড়াইয়ে দাঁড়াবেন না। বর্তমানে মামলাটি কোতোয়ালি থানা থেকে রংপুর মহানগর পুলিশের ডিবি (গোয়েন্দা শাখা) কার্যালয়ে স্থানান্তর করা হয়েছে এবং অধিকতর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য প্রধান আসামি সিদ্ধার্থের বাবা ও ভাইকেও ডিবি হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে মামলার মূল আসামিরা কারাগারে রয়েছে এবং ডিবি পুলিশ ঘটনার পেছনে অন্য কোনো মদদদাতা বা মোটিভ রয়েছে কিনা তা নিশ্চিত করতে ডিএনএ টেস্ট ও ডিজিটাল ফরেনসিক রিপোর্টের অপেক্ষায় তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে।
তবে এমন নির্মম ও নৃশংস ঘটনার সাথে যারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে, ধৃত বা পলায়নরত, প্রকাশ্যে বা অন্তরালে জড়িত তাদেরকে পুলিশ প্রশাসন তথা আইনের আওতায় এনে উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। নাহলে সমাজে এমন ভয়ংকর ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটবে না তার নিশ্চয়তা কী! অন্যদিকে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনের ব্যাঘাত ঘটার পাশাপাশি প্যানিক সৃষ্টি করবে।