মোঃ জুনাইদ মিয়া
প্রতিনিধি মৌলভীবাজার
চা-বাগানের সবুজ পাতায় যাদের শ্রম, ঘাম আর জীবনের গল্প মিশে আছে, সেই চা শ্রমিকদের দৈনিক নগদ মজুরি ১৯৬ টাকা নির্ধারণকে অযৌক্তিক ও অগ্রহণযোগ্য বলে তীব্র ক্ষোভ জানিয়েছে বাংলাদেশ চা শ্রমিক ফেডারেশন কেন্দ্রীয় কমিটি। সংগঠনটি চা শ্রমিকদের দৈনিক নগদ মজুরি ৫০০ টাকা ঘোষণার দাবি জানিয়েছে।
বুধবার (১২ আগস্ট) সংবাদপত্রে প্রকাশের জন্য দেওয়া এক বিবৃতিতে এ দাবি জানান বাংলাদেশ চা শ্রমিক ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি বিপ্লব মাদ্রাজি পাশী ও সাধারণ সম্পাদক দীপংকর ঘোষ।
বিবৃতিতে নেতৃবৃন্দ বলেন, দৈনিক নগদ মজুরি ৫০০ টাকা, শ্রমিক স্বার্থবিরোধী গেজেট-২০২৩ বাতিল, চা শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচন এবং চা শ্রমিকদের ভূমির স্থায়ী মালিকানা নিশ্চিত করা—এই চার দফা দাবিতে চা শ্রমিকদের আন্দোলন চলছে। এই আন্দোলনকে বিভ্রান্ত ও দুর্বল করতেই বাংলাদেশ চা সংসদ একতরফাভাবে ১৯৬ টাকা দৈনিক মজুরি ঘোষণা করেছে বলে তারা অভিযোগ করেন।
নেতৃবৃন্দ বলেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধিতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় যখন প্রতিনিয়ত বাড়ছে, তখন মাত্র ১৯৬ টাকা দৈনিক মজুরি দিয়ে একজন চা শ্রমিক ও তার পরিবারের ন্যূনতম প্রয়োজন মেটানোও অসম্ভব। এই মজুরি ঘোষণা শ্রমিকদের প্রতি চরম অবিচার ও বঞ্চনার বহিঃপ্রকাশ।
তারা বলেন, দেশের অর্থনীতিতে চা শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। সরকার চা শিল্পকে লাভজনক রফতানিমুখী শিল্প হিসেবে এগিয়ে নেওয়ার কথা বলছে। কিন্তু যে শ্রমিকদের ঘাম ও পরিশ্রমে বছরের পর বছর চা শিল্প সমৃদ্ধ হচ্ছে, তাদের জীবনমানের তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি। যুগের পর যুগ শোষণ, বঞ্চনা ও শ্রমদাসত্বের শৃঙ্খলে চা শ্রমিক জনগোষ্ঠীকে আটকে রাখা হয়েছে। এই বন্দিদশার অবসান ঘটিয়ে চা শ্রমিকদের মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করতে হবে।
বিবৃতিতে নেতৃবৃন্দ বলেন, বাংলাদেশ চা শ্রমিক ফেডারেশন দীর্ঘদিন ধরে চা শ্রমিকদের দৈনিক নগদ মজুরি ৬০০ টাকা করার দাবিতে আন্দোলন করে আসছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে বাগান নেতৃত্বের পক্ষ থেকে উত্থাপিত ৫০০ টাকা দৈনিক নগদ মজুরি ঘোষণার দাবির আন্দোলনকে তারা সমর্থন করছেন।
তারা আরও বলেন, ৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্টের মাধ্যমে চা শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণের গেজেট-২০২৩ শ্রমিকদের স্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তাই অবিলম্বে ওই গেজেট বাতিল করে চা শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নির্ধারণে জাতীয় মজুরি বোর্ড গঠন করতে হবে।
একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচন দ্রুত আয়োজনের দাবি জানিয়ে নেতৃবৃন্দ বলেন, শ্রমিকদের গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত করতে অবিলম্বে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করতে হবে। অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে শ্রমিকদের প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করারও দাবি জানান তারা।
চা শ্রমিকদের ভূমির অধিকার প্রসঙ্গে নেতৃবৃন্দ বলেন, যুগের পর যুগ চা-বাগানে বসবাস করেও শ্রমিকরা তাদের বসতভিটা ও ভূমির স্থায়ী মালিকানা থেকে বঞ্চিত। তাই চা শ্রমিকদের ভূমির স্থায়ী মালিকানা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি শ্রমিক পরিবারের জন্য মানসম্মত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করার দাবি জানান তারা।
নেতৃবৃন্দ বলেন, শুধু মজুরি বাড়ালেই চা শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের বঞ্চনার অবসান হবে না। মজুরির পাশাপাশি ভূমির অধিকার, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, শ্রমিকদের সাংগঠনিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার এবং সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে।
তারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, চা শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি উপেক্ষা করে কোনো একতরফা সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হলে শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের আন্দোলন আরও জোরদার হবে। চা শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি মেনে নিয়ে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সরকার ও চা-বাগান মালিকদের প্রতি আহ্বান জানান বাংলাদেশ চা শ্রমিক ফেডারেশনের নেতৃবৃন্দ।