কুড়িগ্রামের মানুষ আবারও প্রকৃতির নির্মম রূপের মুখোমুখি। উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল আর টানা বৃষ্টিপাতের কারণে জেলার প্রধান নদ-নদীগুলোর পানি ক্রমাগত বাড়ছে। যদিও এখনো কোনো নদীর পানি বিপদসীমা অতিক্রম করেনি, তবুও নদীপাড়ের মানুষের মনে নেমে এসেছে অজানা আতঙ্ক। কারণ, তাদের চোখের সামনেই ধীরে ধীরে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে বহু বছরের গড়া স্বপ্ন, স্মৃতি আর জীবনের একমাত্র আশ্রয়।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ধরলা, দুধকুমার ও ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। নদীর পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জেলার চরাঞ্চল ও নিম্নাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হতে শুরু করেছে। কোথাও কোথাও ফসলি জমিতে পানি ঢুকে পড়েছে, তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে গ্রামীণ সড়ক ও জনপদ।
কিন্তু শুধু পানি বৃদ্ধি নয়, মানুষের সবচেয়ে বড় দুঃস্বপ্ন হয়ে উঠেছে নদীভাঙন। জেলার বিভিন্ন এলাকায় ইতোমধ্যেই ভয়াবহ ভাঙন শুরু হয়েছে। একের পর এক বসতভিটা, আবাদি জমি ও গাছপালা নদীগর্ভে হারিয়ে যাচ্ছে। অসহায় মানুষ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছেন নিজের জীবনের সঞ্চয়, পূর্বপুরুষের ভিটেমাটি আর স্মৃতিবিজড়িত ঘরবাড়ি নদীর স্রোতে বিলীন হয়ে যেতে।
নদীপাড়ের এক বাসিন্দা চোখের জল মুছতে মুছতে বলেন, “সবকিছু শেষ হয়ে যাচ্ছে। আমাদের আর কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই। চোখের সামনে ঘরটা ভেঙে নদীতে চলে যাচ্ছে, শুধু তাকিয়ে দেখা ছাড়া কিছুই করার নেই।”
আরেকজন বৃদ্ধ জানান, “এই ভিটাতেই জন্মেছি, সন্তানদের বড় করেছি। আজ নদী সব নিয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে নিজের অস্তিত্বটাই হারিয়ে ফেলছি।”
প্রতিদিনই নতুন নতুন এলাকা ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়ছে। আতঙ্কে রাত কাটাচ্ছেন হাজারো পরিবার। কেউ ঘর সরানোর চেষ্টা করছেন, কেউ গবাদিপশু ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিরাপদ স্থানে নেওয়ার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। কিন্তু অনেকেরই সেই সামর্থ্য নেই।
পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, আগামী কয়েকদিন নদ-নদীর পানি আরও বাড়তে পারে। পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং নদীতীরবর্তী ও চরাঞ্চলের বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।
এখনো বড় ধরনের বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি না হলেও কুড়িগ্রামের মানুষের মনে ভয় আরও গভীর হচ্ছে। কারণ তারা জানেন, নদীর পানি বাড়লে শুধু জমি নয়, হারিয়ে যেতে পারে তাদের জীবনসংগ্রামের শেষ সম্বলটুকুও।
কুড়িগ্রামের নদীপাড়ে আজ শুধু নদীর পানি বাড়ছে না, বাড়ছে হাজারো মানুষের দীর্ঘশ্বাসও। নিজের চোখের সামনে প্রিয় বসতভিটা ভেঙে যেতে দেখার যে অসহনীয় কষ্ট, তা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। নদীর গর্জনের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে মানুষের কান্না,আর সেই কান্না যেন পৌঁছে যাচ্ছে পুরো দেশের বিবেকের দরজায়।